img

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব ছাড়ার আগেই কয়েকজন উপদেষ্টার ‘কূটনৈতিক পাসপোর্ট’ বা ‘লাল পাসপোর্ট’ জমা দেওয়ার বিষয়টি সম্প্রতি নানা প্রশ্ন আর কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।

সাধারণত পদত্যাগের পর এই পাসপোর্ট জমা বা সমর্পণ করার রীতি থাকলেও কেন আগেভাগেই এই তোড়জোড়, সেটি নিয়েই মূলত আলোচনা।

সম্প্রতি কয়েকজন উপদেষ্টার ‘কূটনৈতিক পাসপোর্ট’ জমা দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের এক বক্তব্যে।

তিনি বলেন, ‘মন্ত্রীদের কেউ কেউ করেছেন (কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা), কারণ এরপর তাদের বাইরে যাওয়ার প্রশ্ন আছে। পাসপোর্ট এখন থেকেই নিয়ে নিলেন যাতে ভিসা নিতে সহজ হয়, সময়মতো যাতে নিতে পারেন। নিয়েছেন কেউ কেউ এটা ঠিক।’

যদিও উপদেষ্টা পরিষদের কে বা কতজন সদস্য কূটনৈতিক পাসপোর্ট সমর্পণ করেছেন এটি নির্দিষ্ট করে বলেননি তিনি। এছাড়া নিজের পাসপোর্ট এখনো জমা দেননি বলেও সাংবাদিকদের জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।

তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘আমি বা আমার স্ত্রী ডিপলোমেটিক পাসপোর্ট সারেন্ডার করিনি। আমার পাসপোর্ট এখনো আমার কাছেই আছে এবং যথারীতি ওটা বহাল আছে।’

দায়িত্বের মেয়াদ থাকা অবস্থায় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বা মন্ত্রীর নিজের কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেওয়ার বিষয়টি ‘খুব অস্বাভাবিক’ বলেও মন্তব্য করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।

নিজের কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা বা সমর্পণের বিষয়টি স্বীকার করেছেন অর্থ উপেদষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।

তিনি বলছেন, ‘আমি দিয়ে দিয়েছি (কূটনৈতিক পাসপোর্ট)। আমি আর যাবো না কোথাও। আমি সাধারণত জরুরি কোনো মিটিং ছাড়া যাইও না। আমি দিয়ে দিয়েছি, অনেকেই দিয়ে দিয়েছে।’

এছাড়া উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানও নিজের কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন বলেও জানা গেছে।

বিষয়টি সামনে আসার পর থেকেই এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কেন উপদেষ্টাদের অনেকে কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিচ্ছেন, এমন প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

নির্বাচনের আগ মুহূর্তে কয়েকজন উপদেষ্টার এমন পদক্ষেপ নিয়ে সন্দেহ বা প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে বলেই মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে।

দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্ট সমর্পণ করার ঘটনা ‘বিরল’ বলেই জানান সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ।

প্রশ্ন উঠেছে যে কারণে

দায়িত্বরত অবস্থায় কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিলে বা সমর্পণ করলে আইন অনুযায়ী প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। কারণ দায়িত্ব পালন শেষে দেশের বাইরে যাওয়ার প্রশ্ন থাকায় এমন পদক্ষেপ যে কেউ নিতে পারেন।

তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়ে সাধারণ পাসপোর্ট নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন উঠছে কেন?

এক্ষেত্রে দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটের উদাহরণ টানছেন বিশ্লেষকদের অনেকে।

তারা বলছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সরকার পরিবর্তনের পর দায়িত্ব নিয়ে প্রায় দুই বছর পর, নির্বাচনের আগ মুহূর্তে উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন সদস্যের এমন পদক্ষেপ মানুষের মধ্যে সন্দেহের তৈরি করতে পারে।

এছাড়া প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নিয়ে উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসেব দেওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন সেটিও এখন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন তৈরির সুযোগ রয়েছে বলেই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ।

তিনি বলছেন, ‘যে সময়ে এটা করা হচ্ছে, সেটি নির্বাচনোত্তর পরিবেশের সাথে রিলেট করার তো সুযোগ আছে, সন্দেহ করার যথেষ্ট সুযোগ আছে।’

তবে, এক্ষেত্রে কতজন উপদেষ্টা কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাদ দিয়ে সাধারণ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন সেটি গুরুত্বপূর্ণ বলেও মনে করেন তিনি।

‘দুই একজন হলে সমস্যা দেখি না। কারণ অনেকে তো বিদেশে থাকেন, মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা রয়েছে। কূটনৈতিক পাসপোর্ট থাকলে তো এগুলোর গুরুত্ব থাকবে না। তাই আগে থেকেই একটা প্রস্তুতি নিয়ে রাখছেন’, বলেন সাব্বির আহমেদ।

নির্বাচনের পর পরিস্থিতি কোন দিকে যায় এবং নিজেদের নিরাপত্তা ইস্যু নিয়েও অনেকের চিন্তা থাকতে পারে বলেও মনে করেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।

কোনো ঝুঁকি নিতে চান না বলে আগেভাগেই উপদেষ্টারা এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ।

তিনি বলছেন, ‘উনারা হয়তো মনে করেছেন এখন দিয়ে দিলে প্রক্রিয়াটা সহজ হবে। কারণ উনারা দায়িত্বে আছেন, দায়িত্ব থেকে চলে গেলে সমস্যা হতে পারে। যারা ক্ষমতায় আসবেন তারা কোনো বিধিনিষেধ দিয়ে দেয় কি না, এটা তো আগে থেকে বলা যায় না।’

যদিও এতে কোনো সমস্যা দেখছেন না সাব্বির আহমেদ।

‘কেউ যদি তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাদ দিয়ে সাধারণ পাসপোর্ট কার্যকর করতে চান এতে বাধা দেওয়ার কিছু নেই। আইনেও কোনো সমস্যা নেই’, বলেন তিনি।

তবে দায়িত্ব চলমান থাকা অবস্থায় কূটনৈতিক পাসপোর্ট না থাকলে তার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা চলে আসবে। এছাড়া এমন উদাহরণ অতীতে খুব একটা নেই বলেও জানান তিনি।

লাল পাসপোর্টের সুবিধা কী?

বাংলাদেশে পাসপোর্ট সংক্রান্ত প্রধান আইন হলো বাংলাদেশ পাসপোর্ট আদেশ, ১৯৭৩ এবং পাসপোর্ট বিধিমালা, ১৯৭৪।

এই আইনের অধীনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর ই-পাসপোর্ট ইস্যু করে, যা আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা বা আইসিএও-এর মানসম্মত।

পাশাপাশি কূটনৈতিক পাসপোর্ট বা লাল পাসপোর্টের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় অনুসরণীয় নীতিমালা জারি করে সরকার। এছাড়া যোগ্যতার ভিত্তিতে এই পাসপোর্ট কারা পাবেন সেই তালিকাও নির্দিষ্ট।

বাংলাদেশ সরকার মূলত তিন ধরনের পাসপোর্ট ইস্যু করে, যা তিন রংয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়ে থাকে। সাধারণ মানুষের জন্য সবুজ, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নীল এবং কূটনীতিকদের জন্য লাল রংয়ের পাসপোর্ট।

কূটনৈতিক বা ‘লাল’ পাসপোর্ট সাধারণত রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, বিচারপতি, সচিব, এবং বিদেশে কর্মরত কূটনীতিকদের জন্য ইস্যু করা হয়।

এছাড়া দেশের বাইরে কূটনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বা রাষ্ট্রীয় কূটনীতিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের জন্যও এই ক্যাটাগরির পাসপোর্ট ইস্যু করতে পারে সরকার।

তবে, পদ বা মেয়াদ শেষ হলে এই পাসপোর্ট বাতিল বা জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।

আন্তর্জাতিক দায়মুক্তি, দ্রুত কাস্টমস চেক এবং ভিসা সুবিধাসহ বেশ কিছু সুবিধা পান এই ধরণের পাসপোর্ট বহনকারীরা।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলছেন, ‘কূটনৈতিক পাসপোর্ট থাকলে যেকোনো দেশে ঝট করে চলে যাওয়া যায়, বেশিরভাগ দেশেই ভিসার প্রয়োজন পড়ে না।’

তবে কূটনৈতিক পাসপোর্ট থাকলেই সব ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবে বিষয়টি এমন নয় বলেও জানান সাব্বির আহমেদ।

তিনি বলছেন, ‘কেবল দায়িত্বরত কূটনীতিকরাই এটি পান। একজন কূটনীতিক যে দেশে দায়িত্বরত আছেন সেই দেশে তিনি যে সুবিধা পাবেন, অন্য দেশে সবগুলো পাবেন না।’

এছাড়া সরাসরি কূটনৈতিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নন এমন ব্যক্তিরও এই ধরনের পাসপোর্ট থাকতে পারে। ‘মন্ত্রী, এমপি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব তারা কূটনৈতিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নন, কিন্তু তাদেরকে কূটনৈতিক পাসপোর্ট দেওয়া হয়। ওগুলো হলো স্পেশাল ক্যাটাগরি’, বলেন তিনি।

এই ধরনের পাসপোর্টধারীদের দেশের বাইরে যেতে অফিসিয়াল জিও বা সরকারি আদেশ লাগে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে সাব্বির আহমেদ বলেন, কূটনৈতিক পাসপোর্ট পাওয়া মানেই তিনি সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা কূটনীতিক।

বিদেশে যাওয়ার সময় একটি লেটার অব ইনট্রোডাকশন সরকার দেয় যেটি জিও হিসেবে গণ্য হয়। তবে ‘কূটনৈতিক হিসেবে কোনো দেশে একজন দায়িত্বরত অবস্থায়, এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে চান তখন আর জিও প্রয়োজন নেই’, বলেন তিনি।

এই বিভাগের আরও খবর